দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথমবার ব্যবহারের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এই ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ইউক্রেন এখন রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চাইছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে নিজেদের প্রতিরক্ষার প্রয়োজন বিবেচনায় ইউরোপের কয়েকটি দেশও তাদের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
প্যাট্রিয়ট হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর নাম ‘ফেজড অ্যারে ট্র্যাকিং রাডার ফর ইন্টারসেপ্ট অন টার্গেট’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। সব ধরনের আবহাওয়ায় এটি ব্যবহার করা যায় এবং বিমান, কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম।
১৯৮০-এর দশকে তৈরি হলেও কয়েক দশকে ব্যবস্থাটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিতে রাডার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ইউনিট, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং সহায়ক যান থাকে। ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন অনুযায়ী এর সক্ষমতাও ভিন্ন হয়।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থায় ব্যবহৃত পিএসি-২ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস করে। অন্যদিকে পিএসি-৩ শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে ধ্বংস করার প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
পিএসি-৩ এমএসই ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান এমনকি কিছু অতিধ্বনির অস্ত্রও প্রতিহত করতে পারে। ২০২৩ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছিল, ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট ব্যবহার করে রাশিয়ার কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ন্যাটোর ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্যাট্রিয়টের রাডারের পাল্লা ১৫০ কিলোমিটারের বেশি এবং এটি একই সময়ে ১০০টি সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করে অনুসরণ করতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের ১৯টি দেশ প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, পোল্যান্ড, ইউক্রেন, জাপান, কাতার, সৌদি আরব ও মিসর রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে ১৬টি দেশ সর্বাধুনিক পিএসি-৩ এমএসই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। অন্তত ছয় থেকে আটটি দেশ মজুত পুনর্গঠনের জন্য নতুন ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার দামও অনেক বেশি। একটি নতুন ব্যাটারির দাম ১০০ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য প্রায় ৬৯ কোটি ডলার। একটি পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক দাম ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার।
মজুত কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। সুনির্দিষ্ট মজুতের তথ্য গোপন থাকলেও কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৮৫০টিরও কম অবশিষ্ট থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মজুতও ব্যাপকভাবে কমেছে। যুদ্ধের প্রথম ৩৮ দিনে সৌদি আরব তার প্রায় ২ হাজার ৮০০টি পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের ৮৬ শতাংশ ব্যবহার করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ সময় দেশটির হাতে প্রায় ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট ছিল। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও তাদের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করেছে।
ইউক্রেনের চাহিদা আরও বাড়ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মজুত পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরবরাহের উদ্যোগও নিয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৫ হাজার ২৫০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাব্য ব্যবস্থার আওতায় ইউক্রেনে কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি করে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে সেগুলো একত্র করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
এর পাশাপাশি গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী লকহিড মার্টিনকে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৮৬০ কোটি ডলারের চুক্তি দিয়েছে।
তবে নতুন উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগায় তাৎক্ষণিকভাবে সংকট কাটছে না। ফলে ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ও মজুত আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
/অ